বিয়েতে কুষ্ঠি মিলন: অষ্টকূট আর ৩৬ গুণের হিসাব
বাংলা আর উত্তর ভারতের বিয়েতে "কুষ্ঠি মেলানো" প্রায় অবধারিত। এর প্রচলিত পদ্ধতি অষ্টকূট, অর্থাৎ আটটা কূট বা মাপকাঠি। মোট ৩৬ গুণ (পয়েন্ট)। সবকিছুই বর আর কনের জন্মনক্ষত্র আর চন্দ্ররাশি থেকে গোনা হয়, তাই এর জন্য দুজনের সঠিক জন্মনক্ষত্র জানা দরকার।
আটটা কূট
| কূট | গুণ | কী মাপে | কিসের ভিত্তিতে |
|---|---|---|---|
| বর্ণ | ১ | স্বভাব আর মানসিকতার মিল | চন্দ্ররাশি |
| বশ্য | ২ | পারস্পরিক আকর্ষণ, কে কার প্রভাবে | চন্দ্ররাশি |
| তারা | ৩ | ভাগ্য আর স্বাস্থ্যের মিল | নক্ষত্রের দূরত্ব |
| যোনি | ৪ | শারীরিক আর সহজাত মিল | নক্ষত্রের যোনি (প্রাণী-প্রতীক) |
| গ্রহমৈত্রী | ৫ | মনের মিল, বন্ধুত্ব | চন্দ্ররাশির অধিপতিদের মৈত্রী |
| গণ | ৬ | মেজাজ আর আচরণ | নক্ষত্রের গণ (দেব, মনুষ্য, রাক্ষস) |
| ভকূট | ৭ | পারিবারিক সমৃদ্ধি, বোঝাপড়া | দুই চন্দ্ররাশির পারস্পরিক অবস্থান |
| নাড়ী | ৮ | স্বাস্থ্য আর সন্তান | নক্ষত্রের নাড়ী (আদি, মধ্য, অন্ত্য) |
| মোট | ৩৬ |
কত গুণ মিললে চলে
প্রচলিত মত:
- ১৮ এর কম: সাধারণত বিয়ের পরামর্শ দেওয়া হয় না।
- ১৮ থেকে ২৪: চলনসই, অন্য দিক দেখে সিদ্ধান্ত।
- ২৫ থেকে ৩২: ভালো মিল।
- ৩৩ থেকে ৩৬: খুব ভালো।
কিন্তু এই সংখ্যার চেয়েও জরুরি দুটো দোষ।
নাড়ী দোষ
২৭ নক্ষত্র তিন নাড়ীতে ভাগ: আদি, মধ্য আর অন্ত্য। বর আর কনের নাড়ী একই হলে নাড়ী কূটে শূন্য, আর একে নাড়ী দোষ বলে। প্রথাগতভাবে এটাকে সবচেয়ে বড় দোষ ধরা হয়, সন্তান আর স্বাস্থ্যের প্রশ্নে।
তবে শাস্ত্রেই এর ব্যতিক্রম আছে। যেমন দুজনের নক্ষত্র এক কিন্তু রাশি আলাদা, বা রাশি এক কিন্তু নক্ষত্র আলাদা, বা নক্ষত্র এক কিন্তু পাদ আলাদা হলে নাড়ী দোষ অনেকটা কাটে বলে অনেক আচার্য মনে করেন। দুজনের চন্দ্ররাশির অধিপতি এক বা বন্ধু হলেও দোষ শিথিল ধরা হয়।
ভকূট দোষ
দুজনের চন্দ্ররাশি একে অপর থেকে দ্বিতীয়-দ্বাদশ, পঞ্চম-নবম বা ষষ্ঠ-অষ্টম অবস্থানে থাকলে ভকূট কূটে শূন্য। ষষ্ঠ-অষ্টম (ষড়াষ্টক) সবচেয়ে কঠিন ধরা হয়। এখানেও ব্যতিক্রম আছে: দুই রাশির অধিপতি এক গ্রহ হলে (যেমন মেষ-বৃশ্চিক, বৃষ-তুলা) বা পরস্পরের বন্ধু হলে দোষ কাটে।
একটা উদাহরণ
বরের নক্ষত্র রোহিণী (বৃষ রাশি), কনের নক্ষত্র শ্রবণা (মকর রাশি)। বৃষ থেকে মকর নবম, মকর থেকে বৃষ পঞ্চম, তাই ভকূটে পঞ্চম-নবম দোষ। কিন্তু বৃষের অধিপতি শুক্র আর মকরের অধিপতি শনি পরস্পরের বন্ধু, তাই দোষ শিথিল। রোহিণী আর শ্রবণা দুটোই অন্ত্য নাড়ী, তাই নাড়ী দোষও আছে; এখানে দুজনের নক্ষত্র আর রাশি দুটোই আলাদা, তাই ব্যতিক্রম খাটে কি না সেটা বাকি ছক দেখে ঠিক করতে হবে। এ ধরনের ক্ষেত্রেই শুধু সংখ্যায় না থেমে পূর্ণ বিচার দরকার।
গুণ মিলনের সীমা
অষ্টকূট শুধু চাঁদের অবস্থান দেখে। দুজনের লগ্ন, সপ্তম ঘর, শুক্র আর বৃহস্পতির অবস্থা, মাঙ্গলিক বিচার, চলতি দশা, এগুলো এতে আসে না। তাই ৩২ গুণ মিলেও দাম্পত্যে টানাপোড়েন হতে পারে, আবার ১৯ গুণে অনেকে সুখে সংসার করেন।
ভালো জ্যোতিষী অষ্টকূটকে প্রথম ছাঁকনি হিসেবে ব্যবহার করেন, তারপর দুজনের পুরো ছক পাশাপাশি রেখে বিচার করেন। আর জ্যোতিষ যা-ই বলুক, দুজন মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বোঝাপড়া আর পরিবারের সমর্থনের জায়গা কোনো গুণের হিসাব নিতে পারে না। মাঙ্গলিক বিচার নিয়ে আলাদা লেখা আছে: মাঙ্গলিক দোষ।
সাধারণ প্রশ্ন
অষ্টকূটে মোট কত গুণ?
৩৬ গুণ: বর্ণ ১, বশ্য ২, তারা ৩, যোনি ৪, গ্রহমৈত্রী ৫, গণ ৬, ভকূট ৭ আর নাড়ী ৮।
কত গুণ মিললে বিয়ে চলে?
প্রচলিত মতে অন্তত ১৮ গুণ। তবে নাড়ী আর ভকূট দোষ আর পুরো ছকের বিচার সংখ্যার চেয়ে বেশি জরুরি।
নাড়ী দোষ কী?
বর আর কনের নক্ষত্রের নাড়ী একই হলে নাড়ী কূটে শূন্য পড়ে। একে নাড়ী দোষ বলে; শাস্ত্রে এর কিছু ব্যতিক্রমও আছে।
এই বিষয়ে আরও পড়ুন
- জন্মকুণ্ডলী পড়ার ধাপ: ছক চেনা থেকে বিচার পর্যন্ত
- লগ্ন অনুযায়ী শুভ, অশুভ আর যোগকারক গ্রহ
- কুণ্ডলীর প্রধান যোগ: গজকেশরী, পঞ্চমহাপুরুষ, রাজযোগ, ধনযোগ আর কেমদ্রুম
- নবাংশ (D9) আর ষোড়শবর্গ: রাশিছকের ভেতরের ছক
- মাঙ্গলিক দোষ: কী, কাদের হয়, আর আসলে কতটা ভয়ের
- রত্ন: কোন গ্রহের কোন রত্ন, কোন আঙুলে, আর কখন পরবেন না