সূর্যগ্রহণ আর চন্দ্রগ্রহণ: কেন হয়, জ্যোতিষে কী বলে, সূতকের নিয়ম
পৃথিবী, চাঁদ আর সূর্য একই সরলরেখায় এলে গ্রহণ হয়। চাঁদ সূর্যের সামনে এসে সূর্যকে ঢেকে দিলে সূর্যগ্রহণ, আর পৃথিবীর ছায়ায় চাঁদ ঢুকে গেলে চন্দ্রগ্রহণ। প্রতি অমাবস্যায় চাঁদ সূর্যের দিকে থাকে, প্রতি পূর্ণিমায় উল্টো দিকে, তবু প্রতি মাসে গ্রহণ হয় না। কারণ চাঁদের কক্ষপথ সূর্যের আপাত পথের সঙ্গে প্রায় ৫ অংশ হেলে আছে।
রাহু-কেতু কোথায় আসে
চাঁদের কক্ষপথ আর সূর্যের পথ দুটো বিন্দুতে কাটাকাটি করে। উত্তরমুখী ছেদবিন্দুর নাম রাহু, দক্ষিণমুখী ছেদবিন্দুর নাম কেতু। অমাবস্যা বা পূর্ণিমা এই বিন্দুগুলোর কাছাকাছি হলে তবেই গ্রহণ হয়। পুরাণের গল্পে রাহু সূর্য-চন্দ্রকে গ্রাস করে; জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় রাহু-কেতু হলো গ্রহণের "জায়গা"। বছরে সাধারণত চার থেকে সাতটা গ্রহণ হয়, অন্তত দুটো সূর্যগ্রহণ।
গ্রহণের রকম
| রকম | কী ঘটে |
|---|---|
| পূর্ণ সূর্যগ্রহণ | চাঁদ সূর্যকে পুরো ঢেকে দেয়; শুধু সরু একটা পথ থেকে দেখা যায় |
| বলয় সূর্যগ্রহণ | চাঁদ দূরে থাকায় ছোট দেখায়, সূর্যের কিনারা আংটির মতো জ্বলে থাকে |
| খণ্ড সূর্যগ্রহণ | সূর্যের একাংশ ঢাকা পড়ে |
| পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ | চাঁদ পুরোপুরি পৃথিবীর প্রচ্ছায়ায়; লালচে দেখায় |
| খণ্ড চন্দ্রগ্রহণ | চাঁদের একাংশ প্রচ্ছায়ায় |
| উপচ্ছায়া চন্দ্রগ্রহণ | চাঁদ শুধু হালকা ছায়ায়; খালি চোখে প্রায় বোঝা যায় না |
চন্দ্রগ্রহণ রাতের দিকের অর্ধেক পৃথিবী থেকে একসঙ্গে দেখা যায়। সূর্যগ্রহণ দেখা যায় সীমিত অঞ্চল থেকে।
জ্যোতিষে গ্রহণ
প্রাচীন গ্রন্থ, বিশেষ করে বরাহমিহিরের বৃহৎসংহিতায় গ্রহণকে দেশ আর সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত ধরা হয়েছে। গ্রহণ যে রাশি আর নক্ষত্রে হয়, তার সঙ্গে জড়িত বিষয় আর অঞ্চল নিয়ে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সাবধানতার কথা বলা হয়। ব্যক্তিগত কুণ্ডলীতে গ্রহণ যদি জন্মরাশি, লগ্ন বা জন্মনক্ষত্রের ওপর পড়ে, তবে সেই মানুষটির জন্য সময়টা বিশেষ বিবেচনার।
একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রথাগত নিয়ম: যে গ্রহণ যেখান থেকে দেখা যায় না, সেখানে তার প্রভাব হালকা, আর সূতকও মানা হয় না। আর উপচ্ছায়া চন্দ্রগ্রহণ শাস্ত্রে গ্রহণ হিসেবেই গণ্য নয়। শুভলগ্নের দেশ ও বিশ্বের ফলে প্রতিটা গ্রহণ কোন দেশ থেকে দেখা যাবে, সেটা হিসাব করে লেখা হয়।
সূতকের নিয়ম
সূতক মানে গ্রহণের আগের অশৌচকাল। প্রচলিত নিয়মে:
- সূর্যগ্রহণে গ্রহণ শুরুর ১২ ঘণ্টা (চার প্রহর) আগে থেকে সূতক।
- চন্দ্রগ্রহণে গ্রহণ শুরুর ৯ ঘণ্টা (তিন প্রহর) আগে থেকে সূতক।
- শিশু, বয়স্ক আর অসুস্থ মানুষের জন্য সূতকের কড়াকড়ি শিথিল; সাধারণত গ্রহণের আগের এক প্রহর থেকে মানলেই চলে।
- সূতকে রান্না করা খাবার, নতুন কাজ আর পূজা এড়ানো হয়; গ্রহণ শেষে স্নান আর দানের প্রথা আছে।
এগুলো ধর্মীয় আচার, বৈজ্ঞানিক বিধান নয়। যিনি মানেন, তিনি নিজের পরিবার আর পঞ্জিকার রীতি অনুসরণ করবেন।
একটা জরুরি সাবধানতা
সূর্যগ্রহণ কখনো খালি চোখে, সাধারণ সানগ্লাস, এক্স-রে ফিল্ম বা পানিতে প্রতিফলন দেখে দেখবেন না; চোখের রেটিনা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সূর্য দেখার জন্য তৈরি সার্টিফায়েড ফিল্টার বা পিনহোল প্রজেকশন ব্যবহার করুন। চন্দ্রগ্রহণ খালি চোখে দেখা সম্পূর্ণ নিরাপদ।
২০২৬-২০২৭ সালের গ্রহণ
| তারিখ (বাংলাদেশ সময়) | গ্রহণ | ঢাকা থেকে |
|---|---|---|
| ১২-১৩ আগস্ট ২০২৬ | পূর্ণ সূর্যগ্রহণ (কর্কট) | দেখা যায়নি |
| ২৮ আগস্ট ২০২৬ | খণ্ড চন্দ্রগ্রহণ (কুম্ভ) | দেখা যায়নি |
| ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ | বলয় সূর্যগ্রহণ (মকর) | দেখা যাবে না |
| ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ | উপচ্ছায়া চন্দ্রগ্রহণ (সিংহ) | দেখা যাবে, তবে শাস্ত্রে গণ্য নয় |
| ২ আগস্ট ২০২৭ | পূর্ণ সূর্যগ্রহণ (কর্কট) | সূর্যাস্তের আগে সামান্য খণ্ডগ্রাস |
সময় আর দৃশ্যমানতা লাহিড়ী অয়নাংশে নিজেদের গণনা থেকে। দেশভেদে বিস্তারিত দেখুন সংশ্লিষ্ট দেশের বার্ষিক ফলে।
সাধারণ প্রশ্ন
গ্রহণ কেন প্রতি মাসে হয় না?
চাঁদের কক্ষপথ সূর্যের পথের সঙ্গে প্রায় ৫ অংশ হেলে আছে। অমাবস্যা বা পূর্ণিমা রাহু-কেতুর (দুই ছেদবিন্দু) কাছাকাছি হলে তবেই গ্রহণ হয়।
চন্দ্রগ্রহণে সূতক কখন শুরু হয়?
প্রচলিত নিয়মে গ্রহণ শুরুর ৯ ঘণ্টা আগে। সূর্যগ্রহণে ১২ ঘণ্টা আগে। যেখান থেকে গ্রহণ দেখা যায় না, সেখানে সূতক মানা হয় না।
উপচ্ছায়া চন্দ্রগ্রহণ কি মানতে হয়?
শাস্ত্রে উপচ্ছায়া গ্রহণকে গ্রহণ হিসেবে গণ্য করা হয় না, তাই এতে সূতক বা গ্রহণের আচার পালনের প্রথা নেই।
এই বিষয়ে আরও পড়ুন
- পঞ্চাঙ্গ: তিথি, বার, নক্ষত্র, যোগ আর করণ কীভাবে গোনা হয়
- তিথি: ত্রিশ তিথির নাম, প্রকৃতি আর কোন কাজে কোন তিথি
- ২৭ নক্ষত্র: নাম, অধিপতি, রাশিভাগ আর পাদ
- বাংলা পঞ্জিকা আর বঙ্গাব্দ: সংক্রান্তি থেকে মাস, বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের হিসাব কেন আলাদা
- রাহুকাল কী, কখন হয় আর কেন এই সময়ে নতুন কাজ শুরু করতে নেই
- শুভ মুহূর্ত বাছাই: অভিজিৎ, রাহুকাল, যমগণ্ড, গুলিক আর অমৃতযোগ