বাংলা পঞ্জিকা আর বঙ্গাব্দ: সংক্রান্তি থেকে মাস, বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের হিসাব কেন আলাদা
বাংলা বছর চাঁদের নয়, সূর্যের হিসাবে চলে। সূর্য নিরয়ন মেষ রাশিতে ঢুকলে বছর শুরু, আর প্রতিবার রাশি বদলালে নতুন মাস। এই রাশি বদলের মুহূর্তকে বলে সংক্রান্তি। চৈত্র সংক্রান্তির পরের দিনই পয়লা বৈশাখ।
মাস আর রাশি
| বাংলা মাস | সূর্য যে রাশিতে | শুরু হয় (প্রায়) |
|---|---|---|
| বৈশাখ | মেষ | ১৪-১৫ এপ্রিল |
| জ্যৈষ্ঠ | বৃষ | ১৫ মে |
| আষাঢ় | মিথুন | ১৫ জুন |
| শ্রাবণ | কর্কট | ১৬ জুলাই |
| ভাদ্র | সিংহ | ১৭ আগস্ট |
| আশ্বিন | কন্যা | ১৭ সেপ্টেম্বর |
| কার্তিক | তুলা | ১৭-১৮ অক্টোবর |
| অগ্রহায়ণ | বৃশ্চিক | ১৬-১৭ নভেম্বর |
| পৌষ | ধনু | ১৬ ডিসেম্বর |
| মাঘ | মকর | ১৪-১৫ জানুয়ারি |
| ফাল্গুন | কুম্ভ | ১৩ ফেব্রুয়ারি |
| চৈত্র | মীন | ১৪-১৫ মার্চ |
তারিখগুলো ঐতিহ্যবাহী (সংক্রান্তিভিত্তিক) হিসাবে আনুমানিক। পৃথিবীর কক্ষপথ উপবৃত্তাকার বলে সূর্য সব রাশিতে সমান সময় থাকে না; গ্রীষ্মে ধীরে চলে, শীতে দ্রুত। তাই ঐতিহ্যবাহী পঞ্জিকায় জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ৩১-৩২ দিনের আর পৌষ-মাঘ ২৯-৩০ দিনের হয়।
সংক্রান্তির দিন কোনটা
সংক্রান্তির মুহূর্ত দিনের যেকোনো সময় হতে পারে। প্রচলিত বাংলা নিয়মে সংক্রান্তি যদি মধ্যরাতের আগে হয়, পরের দিন নতুন মাসের প্রথম দিন; মধ্যরাতের পরে হলে তার পরের দিন। এই নিয়মের কারণে একই সংক্রান্তি থেকে মাস শুরুর তারিখ এক দিন এদিক-ওদিক হয়, আর বিভিন্ন পঞ্জিকায় সামান্য গরমিল দেখা যায়।
বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গ কেন আলাদা
বাংলাদেশ ১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমির সুপারিশে একটা নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে, আর ২০১৯ সালে তা আরেকবার সংশোধন হয়। এখনকার নিয়মে:
- পয়লা বৈশাখ সবসময় ১৪ এপ্রিল।
- বৈশাখ থেকে আশ্বিন, প্রথম ছয় মাস ৩১ দিনের।
- কার্তিক থেকে চৈত্র ৩০ দিনের, শুধু ফাল্গুন ২৯ দিনের (অধিবর্ষে ৩০)।
- ফলে একুশে ফেব্রুয়ারি সবসময় ৮ ফাল্গুন, ১৬ ডিসেম্বর সবসময় ১ পৌষ, ২৬ মার্চ সবসময় ১২ চৈত্র।
পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা আর আসামের বাঙালিরা এখনো ঐতিহ্যবাহী সূর্যসিদ্ধান্ত বা আধুনিক গণনাভিত্তিক পঞ্জিকা মানেন, যেখানে মাস শুরু হয় আসল সংক্রান্তি দেখে। তাই সেখানে পয়লা বৈশাখ কখনো ১৪, কখনো ১৫ এপ্রিল, আর বাকি মাসের তারিখও বাংলাদেশের সঙ্গে এক-দুই দিন আলাদা হয়।
ধর্মীয় তিথি-নক্ষত্রে কোনো ফারাক নেই; ফারাক শুধু বাংলা তারিখের সংখ্যায়।
বঙ্গাব্দ গোনার নিয়ম
পয়লা বৈশাখ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত: খ্রিস্টাব্দ থেকে ৫৯৩ বাদ দিলে বঙ্গাব্দ। ১ জানুয়ারি থেকে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত: ৫৯৪ বাদ দিন। যেমন ১৪ এপ্রিল ২০২৬ থেকে শুরু হয়েছে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, যা চলবে ১৩ এপ্রিল ২০২৭ পর্যন্ত।
বঙ্গাব্দের উৎস নিয়ে দুই মত প্রচলিত। একটা মতে মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য হিজরি চান্দ্রবর্ষকে সৌরবর্ষে বদলে "ফসলি সন" চালু হয়, যা থেকে বঙ্গাব্দ। আরেক মতে এর সূচনা গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের সময়ে। ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ নিয়ে বিতর্ক আছে।
চান্দ্র মাসের হিসাবও থাকে
বাংলা পঞ্জিকায় সৌর মাসের পাশাপাশি চান্দ্র মাসের হিসাবও চলে, কারণ বেশির ভাগ পূজা-পার্বণ তিথি ধরে হয়। দুর্গাপূজা আশ্বিনের শুক্লপক্ষে, কালীপূজা কার্তিকের অমাবস্যায়, দোল ফাল্গুনী পূর্ণিমায়। চান্দ্র বছর সৌর বছরের চেয়ে প্রায় ১১ দিন ছোট, তাই প্রায় তিন বছরে একবার একটা মলমাস (অধিক মাস) যোগ হয়, যাতে উৎসবগুলো ঋতু থেকে সরে না যায়।
শুভলগ্নের দৈনিক পঞ্জিকা পাতায় প্রতিদিনের বঙ্গাব্দ তারিখ, তিথি আর সংক্রান্তি দেখানো হয়।
সাধারণ প্রশ্ন
পয়লা বৈশাখ কবে?
বাংলাদেশে সবসময় ১৪ এপ্রিল। পশ্চিমবঙ্গে মেষ সংক্রান্তি অনুযায়ী ১৪ বা ১৫ এপ্রিল।
বঙ্গাব্দ কীভাবে বের করব?
পয়লা বৈশাখের পর থেকে বছর শেষ পর্যন্ত খ্রিস্টাব্দ থেকে ৫৯৩, আর জানুয়ারি থেকে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত ৫৯৪ বাদ দিন।
বাংলা মাস কি চাঁদের হিসাবে?
না, বাংলা মাস সৌর। সূর্যের রাশি বদলের (সংক্রান্তি) সঙ্গে মাস বদলায়। তবে পূজা-পার্বণের জন্য চান্দ্র তিথির হিসাবও পঞ্জিকায় থাকে।
এই বিষয়ে আরও পড়ুন
- পঞ্চাঙ্গ: তিথি, বার, নক্ষত্র, যোগ আর করণ কীভাবে গোনা হয়
- তিথি: ত্রিশ তিথির নাম, প্রকৃতি আর কোন কাজে কোন তিথি
- ২৭ নক্ষত্র: নাম, অধিপতি, রাশিভাগ আর পাদ
- রাহুকাল কী, কখন হয় আর কেন এই সময়ে নতুন কাজ শুরু করতে নেই
- শুভ মুহূর্ত বাছাই: অভিজিৎ, রাহুকাল, যমগণ্ড, গুলিক আর অমৃতযোগ
- সূর্যগ্রহণ আর চন্দ্রগ্রহণ: কেন হয়, জ্যোতিষে কী বলে, সূতকের নিয়ম