সায়ন আর নিরয়ন: অয়নাংশ কী, আর পত্রিকার রাশির সঙ্গে কেন মেলে না
একই মুহূর্তে সূর্যকে পশ্চিমা জ্যোতিষী বলবেন মেষে, আর বৈদিক জ্যোতিষী বলবেন মীনে। দুজনেই ঠিক, কারণ দুজন রাশিচক্র শুরু করছেন দুই জায়গা থেকে। এই শুরুর বিন্দুর ফারাকের নামই অয়নাংশ।
দুই রকম রাশিচক্র
সায়ন (ট্রপিক্যাল): বসন্ত বিষুব, অর্থাৎ যেদিন দিন-রাত সমান হয় (২০ বা ২১ মার্চ), সেদিন সূর্য যেখানে থাকে সেখান থেকে মেষ শুরু। ঋতুর সঙ্গে বাঁধা। পশ্চিমা জ্যোতিষ আর পত্রিকার রাশিফল এটা মানে।
নিরয়ন (সাইডেরিয়াল): আকাশের স্থির নক্ষত্রের পটভূমি ধরে রাশি গোনা হয়। বৈদিক জ্যোতিষ, পঞ্জিকা আর নক্ষত্রের সব হিসাব এই পদ্ধতিতে।
ফারাকটা আসে কোথা থেকে
পৃথিবীর অক্ষ লাটিমের মতো খুব ধীরে দোলে। এতে বসন্ত বিষুবের বিন্দুটা নক্ষত্রের পটভূমিতে বছরে প্রায় ৫০ বিকলা (৫০.৩ আর্কসেকেন্ড) করে পিছিয়ে যায়। মানে প্রায় ৭২ বছরে এক অংশ, আর প্রায় ২৬ হাজার বছরে পুরো এক চক্র। একে বলে অয়নচলন।
লাহিড়ী মতে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের শেষ দিকে (প্রায় ২৮৫ সালে) দুই রাশিচক্র এক জায়গায় ছিল। তারপর থেকে ফারাক বাড়তে বাড়তে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ অংশ ১৪ কলা (লাহিড়ী মতে)। মানে নিরয়ন হিসাবে প্রতিটা গ্রহ সায়ন হিসাবের চেয়ে প্রায় ২৪ অংশ পিছিয়ে থাকে।
আপনার রাশিতে এর মানে কী
একটা রাশি ৩০ অংশের, আর ফারাক ২৪ অংশ। তাই বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে সায়ন হিসাবে যে রাশি, নিরয়নে সেটা এক রাশি পিছিয়ে যায়। পত্রিকার "সিংহ" মানুষটি বৈদিক হিসাবে খুব সম্ভবত কর্কট। শুধু যাঁদের সূর্য বা চাঁদ সায়ন রাশির শেষ ছয় অংশে, তাঁদের রাশি দুই হিসাবে একই থাকে।
এজন্যই শুভলগ্নে রাশির পাশে "২১ মার্চ থেকে ২০ এপ্রিল" ধরনের কোনো তারিখ দেওয়া হয় না।
কোন অয়নাংশ ঠিক
অয়নচলনের হার নিয়ে বিতর্ক নেই, বিতর্ক হলো শূন্য বিন্দুটা কবে ছিল। এ নিয়ে কয়েকটা মত আছে:
| অয়নাংশ | ২০২৬ সালে আনুমানিক মান | কোথায় চলে |
|---|---|---|
| লাহিড়ী (চিত্রাপক্ষ) | ২৪°১৪′ | ভারত সরকারের পঞ্জিকা সংস্কার কমিটির সুপারিশ, বাংলা ও ভারতের বেশির ভাগ পঞ্জিকা |
| কৃষ্ণমূর্তি (কেপি) | লাহিড়ীর চেয়ে প্রায় ৬ কলা কম | কেপি পদ্ধতির জ্যোতিষীরা |
| রমন | লাহিড়ীর চেয়ে প্রায় দেড় অংশ কম | বি. ভি. রমনের অনুসারীরা |
১৯৫৫ সালে ভারত সরকারের পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি (মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে) চিত্রা নক্ষত্রকে ঠিক তুলার শূন্য বিন্দু থেকে ১৮০ অংশে ধরে লাহিড়ী অয়নাংশ গ্রহণের সুপারিশ করে। তখন থেকে এটাই সবচেয়ে প্রচলিত। শুভলগ্নের সব গণনা লাহিড়ী অয়নাংশে।
সংক্রান্তি আর ঋতু কেন আলাদা
মকর সংক্রান্তি এখন ১৪ জানুয়ারির আশপাশে হয়, অথচ সবচেয়ে ছোট দিন (উত্তরায়ণের শুরু) ২১-২২ ডিসেম্বর। কারণ মকর সংক্রান্তি নিরয়ন হিসাব, আর উত্তরায়ণ সায়ন ঘটনা। প্রায় সতেরোশো বছর আগে দুটো একই দিনে পড়ত। একই কারণে পয়লা বৈশাখ বসন্ত বিষুবের প্রায় ২৪ দিন পরে আসে।
সাধারণ প্রশ্ন
অয়নাংশ কী?
সায়ন (ঋতুভিত্তিক) আর নিরয়ন (নক্ষত্রভিত্তিক) রাশিচক্রের শুরুর বিন্দুর মধ্যে কোণের ফারাক। ২০২৬ সালে লাহিড়ী মতে এটা প্রায় ২৪ অংশ ১৪ কলা।
পত্রিকার রাশি আর বৈদিক রাশি আলাদা কেন?
পত্রিকা সায়ন পদ্ধতিতে রাশি দেয়, বৈদিক জ্যোতিষ নিরয়ন পদ্ধতিতে। প্রায় ২৪ অংশ ফারাকের কারণে বেশির ভাগ মানুষের রাশি এক ঘর পিছিয়ে যায়।
শুভলগ্ন কোন অয়নাংশ ব্যবহার করে?
লাহিড়ী (চিত্রাপক্ষ) অয়নাংশ, যা ভারত সরকারের পঞ্জিকা সংস্কার কমিটির সুপারিশ আর বাংলা পঞ্জিকাগুলোতেও প্রচলিত।
এই বিষয়ে আরও পড়ুন
- বারো রাশি: স্বভাব, তত্ত্ব আর অধিপতি গ্রহ
- নবগ্রহ: কোন গ্রহ কী বোঝায়, শুভ না অশুভ
- বারো ভাব: কুণ্ডলীর কোন ঘর কী বলে
- লগ্ন কী, কীভাবে বের হয়, আর জন্মসময় কেন এত জরুরি
- নিজের রাশি কীভাবে জানবেন: জন্মরাশি, লগ্ন আর তারিখের রাশির পার্থক্য
- গ্রহের বল: উচ্চ, নীচ, মূলত্রিকোণ আর স্বক্ষেত্র
- গ্রহের মৈত্রী: কোন গ্রহ কার বন্ধু, কার শত্রু
- গ্রহের দৃষ্টি: কোন গ্রহ কোন ঘর দেখে