২৪ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার৮ কার্তিক ১৪৩৩শুক্লা ত্রয়োদশীরাহুকাল সকাল ৮:৫০ – সকাল ১০:১৫ +8801922770158 English
শুভলগ্নজ্যোতিষী বি. কে. মণ্ডল আমার পরামর্শ নিন

মেদিনী জ্যোতিষ: দেশ আর বিশ্বের সময় কীভাবে বিচার হয়

রাশিফল বলে একজন মানুষের সময়। কিন্তু একই সময়ে গোটা দেশের বাজার, আবহাওয়া, সরকার আর জনজীবনেও একটা সুর বয়ে যায়। জ্যোতিষের যে শাখা দেশ, সমাজ আর পৃথিবীর এই সময় বিচার করে, তার নাম মেদিনী জ্যোতিষ ("মেদিনী" মানে পৃথিবী)। ইংরেজিতে একে মান্ডেন অ্যাস্ট্রোলজি বলে।

প্রাচীন উৎস

ষষ্ঠ শতাব্দীর জ্যোতির্বিদ বরাহমিহিরের বৃহৎসংহিতা মেদিনী জ্যোতিষের প্রধান প্রাচীন গ্রন্থ। সেখানে গ্রহের চলাচল, গ্রহণ, ধূমকেতু, বৃষ্টির পূর্বাভাস, ফসল, বাজারদর আর রাজ্যের শুভাশুভ নিয়ে আলাদা আলাদা অধ্যায় আছে। ভারতীয় উপমহাদেশে পঞ্জিকার "বর্ষফল", বছরের রাজা-মন্ত্রী আর "মেঘাধিপতি"র মতো ধারণা এই ধারা থেকেই এসেছে। আধুনিক কালে বি. ভি. রমনের মতো জ্যোতিষীরা ঋতু-সংক্রান্তির ছক রাজধানী ধরে কষার পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করেছেন।

মূল পদ্ধতি: মুহূর্তের ছক রাজধানীর আকাশে

মানুষের জন্মমুহূর্ত থাকে, দেশের থাকে না (স্বাধীনতার দিন নিয়েও প্রায়ই বিতর্ক থাকে)। তাই প্রাচীন পদ্ধতি হলো আকাশের নির্দিষ্ট কিছু মুহূর্তে রাজধানীর ওপর যে ছক তৈরি হয়, সেটা দেশের ছক হিসেবে পড়া:

  • মেষ সংক্রান্তি: সূর্য নিরয়ন মেষে ঢোকার মুহূর্ত, অর্থাৎ জ্যোতিষের নতুন বছর। এই ছক বছরের মূল ছক।
  • চার প্রধান সংক্রান্তি: মকর, মেষ, কর্কট আর তুলা সংক্রান্তির ছক তিন মাস করে চার পর্বের ফল দেয়।
  • অমাবস্যা: প্রতিটা অমাবস্যার ছক পরের চার সপ্তাহের সুর ঠিক করে।
  • গ্রহণ: সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ যে দেশ থেকে দেখা যায়, সেখানে বিশেষ গুরুত্ব পায়।

একই মুহূর্তে ঢাকা, দিল্লি আর লন্ডনের আকাশে আলাদা লগ্ন ওঠে, তাই একই গ্রহ তিন দেশের ছকে তিন আলাদা ঘরে পড়ে। এভাবেই প্রতিটা দেশের ফল আলাদা হয়।

লগ্নের প্রকৃতি দেখে ছক কতদিন চলবে

মেষ সংক্রান্তির ছকে লগ্ন চর রাশি (মেষ, কর্কট, তুলা, মকর) হলে সেই ছক মূলত তিন মাস কার্যকর ধরা হয়, পরের পর্ব পরের সংক্রান্তির ছক থেকে। দ্বিস্বভাব রাশি হলে ছয় মাস, স্থির রাশি হলে পুরো বছর।

দেশের ছকে বারো ঘর

ঘরদেশের জন্য অর্থ
১জনগণ, জনজীবনের সামগ্রিক অবস্থা, জাতীয় মনোবল
২রাজকোষ, অর্থনীতি, ব্যাংক, খাদ্যের মজুত
৩যোগাযোগ, পরিবহন, গণমাধ্যম, প্রতিবেশী দেশ
৪জমি, কৃষি, আবাসন, বিরোধী পক্ষ, সাধারণ মানুষের মনের শান্তি
৫শিক্ষা, তরুণ সমাজ, বিনোদন, শেয়ারবাজার
৬জনস্বাস্থ্য, শ্রমিক, সেনা ও পুলিশ, ঋণ
৭বিদেশ সম্পর্ক, বাণিজ্যচুক্তি, যুদ্ধ আর শান্তি
৮দুর্যোগ, মৃত্যুহার, জাতীয় ঋণ, হঠাৎ ঘটনা
৯আদালত, ধর্ম, উচ্চশিক্ষা, দূরপাল্লার বাণিজ্য
১০সরকার, শাসক, প্রশাসন, জাতীয় মর্যাদা
১১সংসদ, রাজস্ব আয়, মিত্র দেশ
১২সরকারি ব্যয়, হাসপাতাল, কারাগার, গোপন শত্রু ও তৎপরতা

এরপর প্রতিটা গ্রহের স্বভাব আর অবস্থা মিলিয়ে বিচার: যেমন চতুর্থে শনি কৃষক আর জমির সমস্যার ইঙ্গিত, দশমে বৃহস্পতি প্রশাসনে স্থিতিশীলতা, অষ্টমে মঙ্গল আগুন আর দুর্ঘটনার ঝুঁকি। চাঁদ জনসাধারণের প্রতীক, তাই অমাবস্যা বা সংক্রান্তির ছকে চাঁদ কেমন আছে, তা দিয়ে মানুষের মেজাজ বোঝা হয়।

বিশ্বের জন্য কালপুরুষ

গোটা বিশ্বের কোনো রাজধানী নেই। তাই বিশ্বের ফলে কালপুরুষ ছক ব্যবহার হয়: মেষ রাশি প্রথম ঘর, বৃষ দ্বিতীয়, এভাবে মীন দ্বাদশ। গ্রহেরা কোন রাশিতে, সেটাই সরাসরি বলে মানবসমাজের কোন দিক এখন চাপে বা সুবিধায়।

নবনায়ক: বছরের নয় কর্তা

পঞ্জিকার প্রথায় প্রতি বছরের একজন রাজা, একজন মন্ত্রীসহ নয়জন নায়ক থাকে। রাজা ঠিক হয় চৈত্র শুক্লা প্রতিপদের বার থেকে, মন্ত্রী মেষ সংক্রান্তির বার থেকে, মেঘাধিপতি সূর্যের আর্দ্রা নক্ষত্রে প্রবেশের বার থেকে, এভাবে। যেমন বিক্রম সংবৎ ২০৮৩ (২০২৬-২৭) এর রাজা বৃহস্পতি আর মন্ত্রী মঙ্গল, কারণ চৈত্র শুক্লা প্রতিপদ পড়েছিল বৃহস্পতিবারে আর মেষ সংক্রান্তি মঙ্গলবারে। এগুলো মূলত বৃষ্টি, ফসল আর বাজারদরের প্রথাগত ইঙ্গিত।

শুভলগ্নের দেশফল কীভাবে তৈরি হয়

শুভলগ্নের দেশ ও বিশ্বের ফল বিভাগে বিশ্ব আর তেরোটা দেশের সাপ্তাহিক, মাসিক আর বার্ষিক ফল আছে। প্রতিটা ফলের পেছনে:

  1. গ্রহের অবস্থান নিজেরা গুনে বের করা হয়, লাহিড়ী অয়নাংশে। সংক্রান্তির সময় দৃক পঞ্জিকার সঙ্গে প্রায় এক মিনিটের মধ্যে মেলে।
  2. প্রতিটা দেশের ছক কষা হয় তার রাজধানীর অক্ষাংশ-দ্রাঘিমায়; বিশ্বের জন্য কালপুরুষ।
  3. বছরের ফল মেষ সংক্রান্তি আর চার সংক্রান্তির ছক, বছরের গ্রহণ আর বৃহস্পতি-শনি-রাহুর চলাফেরা থেকে।
  4. মাসের ফল অমাবস্যা আর সংক্রান্তির ছক থেকে; সপ্তাহের ফল চলতি অমাবস্যার ছক, সপ্তাহের গ্রহ-চলাচল আর প্রতিদিনের চাঁদ থেকে।
  5. প্রতিটা গ্রহণ কোন দেশ থেকে দেখা যাবে, তা আলাদা করে হিসাব হয়; যেখান থেকে দেখা যায় না, সেখানে প্রভাব হালকা ধরা হয়।
  6. প্রতিটা পাতার নিচে ছকের খুঁটিনাটি থাকে, যাতে জ্যোতিষীরা নিজেরা মিলিয়ে দেখতে পারেন।

সততার কথা

মেদিনী জ্যোতিষ সময়ের প্রবণতা দেখায়: কোন ক্ষেত্রে চাপ বেশি, কোথায় সুবিধা। নির্দিষ্ট ঘটনা, নির্বাচনের ফল বা কোনো ব্যক্তির ভবিষ্যৎ এখান থেকে বলা যায় না, আর শুভলগ্ন তা বলার চেষ্টাও করে না। এই ফল পড়ুন আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো: সাবধান হওয়ার আর পরিকল্পনা করার জন্য, আতঙ্কিত হওয়ার জন্য নয়।

সাধারণ প্রশ্ন

মেদিনী জ্যোতিষ কী?

জ্যোতিষের যে শাখা ব্যক্তির বদলে দেশ, সমাজ আর বিশ্বের সময় বিচার করে। বরাহমিহিরের বৃহৎসংহিতা এর প্রধান প্রাচীন উৎস।

দেশের ফলের জন্য কোন ছক ব্যবহার হয়?

প্রথাগত পদ্ধতিতে মেষ সংক্রান্তি, চার প্রধান সংক্রান্তি আর অমাবস্যার মুহূর্তে দেশের রাজধানীর আকাশে কষা ছক।

বিশ্বের ফল কীভাবে গোনা হয়?

কালপুরুষ ছক ধরে, যেখানে মেষ রাশি প্রথম ঘর আর প্রতিটা রাশি মানবসমাজের একেকটা দিক।